দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ঢোল ও মাদলের তালে তালে নাচছেন নারী-পুরুষ। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে পূজার উপকরণ। মুখে ঝুমুর গানের সুর। মাঠের মাঝখানে পুঁতে রাখা হয়েছে কারাম গাছের ডাল। সেই ডাল ঘিরে নেচে-গেয়ে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গল্প বলছেন সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর হাইস্কুল মাঠের দৃশ্য ছিল এমনই। কারাম উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত আদিবাসী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পত্নীতলা ছাড়াও পাশের মহাদেবপুর, নিয়ামতপুর, পোরশা ও ধামইরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্ধশতাধিক সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখা এ আয়োজন করে। সহযোগিতায় ছিল অ্যাসেড ফাউন্ডেশন ও রুমিয়া প্রফেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট।
উৎসবের শুরু অবশ্য এক দিন আগে। মঙ্গলবার উপজেলার বুজরুক মামুদপুর গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় কারাম পূজা। দিনভর উপোস থাকার পর সন্ধ্যায় গ্রামের একদল কিশোরী কারামগাছের ডাল কেটে এনে পূজার বেদিতে স্থাপন করেন। এরপর দিয়াবাতি, জাওয়া ডালি ও ফলমূল উৎসর্গ করা হয় কারাম দেবতার উদ্দেশে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পূজা স্থলে ভিড় বাড়ে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ জড়ো হন সেখানে। পুরোহিত কিচ্ছার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেন কার্মা ও ধার্মা—দুই ভাইয়ের কাহিনি। কিচ্ছা শেষে নারীরা পরস্পরকে খাবারের আমন্ত্রণ জানিয়ে উপোস ভাঙেন। পরে কারাম ডাল ঘিরে শুরু হয় নাচ-গান।
বুধবার ধর্মীয় বিভিন্ন আচার শেষে গান গাইতে গাইতে কারাম ডাল নিয়ে আসা হয় নজিপুর হাইস্কুল মাঠে। সেখানে নির্ধারিত স্থানে সেটি পুঁতে দেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সাংস্কৃতিক দল কারাম ডাল ঘিরে নাচ ও গান পরিবেশন করে। সবশেষে মাঠ থেকে কারাম ডাল তুলে আত্রাই নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।
কারাম উৎসবের সঙ্গে কৃষি ও প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের। তাদের কাছে এটি মূলত ফসলকেন্দ্রিক উৎসব; ডালপূজা নামেও পরিচিত। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। করম দেবতার উপাসনার মাধ্যমে জমির উর্বরতা ও ফসলের ভালো ফলনের জন্য প্রার্থনা করেন তারা।
বুজরুক গ্রামের বিসরি এক্কা, সোহাগী টপ্প্যা ও ধরনাই বিজিপাড়া গ্রামের সবিতা কুজুরসহ কয়েকজন নারী বলেন, আগে প্রতিবছরই গ্রামে কারাম উৎসব হতো। কিন্তু খরচের কারণে এখন প্রতিবছর আয়োজন করা সম্ভব হয় না। এনজিও বা অন্য কোনো সংগঠন সহযোগিতা করলে উৎসব করা হয়। উৎসব ঘিরে গ্রামে সাজসাজ রব পড়ে যায়। আত্মীয়-স্বজনেরা বাড়িতে আসেন। কয়েক দিনের জন্য হলেও গ্রাম ফিরে পায় পুরোনো সেই প্রাণচাঞ্চল্য।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখার সভাপতি সুবোধ ওঁরাও বলেন, ‘আদিবাসীদের সব উৎসব, পালাপার্বণ, প্রকৃতিকে ঘিরে। কারাম ডাল ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। নতুন ফসল বপনের আচার প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের সম্পর্কের কথাও মনে করিয়ে দেয়। একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, সহযোগিতা ও ঐক্যের বন্ধনই সমাজকে টিকিয়ে রাখে।’
পত্নীতলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক যোগেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সংস্কৃতিপ্রিয় ও সংস্কৃতিবান্ধব। নওগাঁর ১১টি উপজেলার মধ্যে ১০টিতেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। তাদের প্রধান উৎসবগুলোর একটি কারাম। এটি সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রাচীন একটি অনুষ্ঠান।’
স্থানভেদে কারাম পরব পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত চলে। সাঁওতাল, ওরাঁও, মাহাতো, পাহান, মাহালীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নিজেদের রীতি ও বিশ্বাস অনুযায়ী এ উৎসব পালন করেন।
তবে ঐতিহ্যটি ধরে রাখা সহজ হচ্ছে না। অর্থসংকটের কারণে অনেক এলাকায় আগের মতো নিয়মিত আয়োজন হয় না। তাই ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি কারাম উৎসবকে সাংস্কৃতিক পরিচয় টিকিয়ে রাখার মাধ্যম হিসেবেও দেখছেন আয়োজকেরা।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ১৯৯৬ সাল থেকে কারাম পূজাকে ঘিরে নওগাঁসহ সমতলের বিভিন্ন এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সম্মেলনের আয়োজন করে আসছে। আয়োজকদের ভাষ্য, গান, নাচ, কিচ্ছা ও নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তাদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি।
বুধবারের মিলনমেলায় উৎসব উপভোগ করেন পত্নীতলার ইউএনও রিফাত আরা, চলচ্চিত্র শিল্পী ড্যানি সিডাক, ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মির্জা নুরুল গণি শোভন, অ্যাসেড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মুরাদ হোসেনসহ অনেকে।
কারাম ডাল হয়তো কয়েক দিনের আনুষ্ঠানিকতার পর নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। কিন্তু সেটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া গান, নাচ, বিশ্বাস আর পারস্পরিক বন্ধনের স্মৃতি থেকে যায় মানুষের মনে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে তাই কারাম উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়—নিজেদের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও একটি আয়োজন।
/অ